Friday, 4 February 2022

মৃণাল কান্তি দে'র কবিতা

দুটি কবিতা
মৃণাল কান্তি দে


যখন আমি খুব প্রেমিক
         
চাঁদের আলোয় চোখ রেখেছি
মনের আকাশে সাজাই তারা;
মুহূর্তকে তাই আগলে রাখি
আবেগঘন তোমারি সাড়া ||

পাখির পালক যেমন ভিজে
তেমন করে ভেজাও তুমি;
সান্দ্র প্রহর স্নিগ্ধ করে
পরশখানি দাও যখনই ||

এমনভাবে হারিয়ে যেতে
চাই আমি আজ হন্য হয়ে;
নগর যখন শ্রান্ত শিথিল
আমার হৃদয় যাও যে রয়ে ||

তুমি তখন একতারা আর
বাউল মন আমার ভিতর ;
চাহনি টুকু আকরে থাকি
কণ্ঠ থাকে কঠিন নিথর ||

বহ্নিরূপে আবেগ শিরায়
আছরে পড়তে চায় ক্রমিক
আমার হৃদয়ে স্বপ্ন জোয়ার
যখন আমি খুব প্রেমিক ||

তুমি কেন নীরব থেকে
রূপের আলোয় জোছনা গড়;
ভালোবাসায় করেছ আপন
মোর হৃদয় বোধে তুমিই বড় ||

মন খারাপের দিন

মনের কোলে মন রেখেছি
চোখের পাতায় শিশির জল ;
আকাশ যখন মেঘ পেতেছে
দখিন হাওয়ায় গড়ছে দল ||

তখন তুমি একলা বসে
মন কেমনের গল্প শোনো ;
জানলা ধারে ভিজিয়ে আঙুল 
আমায় নিয়ে প্রমাদ গুনো ||

কঠিন সব চিন্তা খানিক
গুটি কতক ভুল ভাবনা ;
আদতে তোমায় আলগা করে
মন ভাঙ্গানো গান সাধনা ||

অল্প যদি ভরে আসে চোখ
মন যদি হয় খুব ভারী ;
চুপ না থেকে উচ্চ কণ্ঠে
করতে পারো আইন ভারী ||

হয়তো আমি নেই পাশে 
তবু শুনবো সবই তোমার রোষ ;
দুঃখ আর রেখো না চেপে 
মেনেই নেবো যা করেছি দোষ ||

জানি আমি ব্যাস্ত ভীষণ 
একরোখা আর বদ মেজাজি ;
সবই শুধু তোমারি জন্য
তোমার হাসিমুখ চাই যে আমি ||
  
  

Thursday, 30 July 2020

রীতা চট্টোপাধ্যায়

আঁধারের ক্যানভাস

রীতা চট্টোপাধ্যায় 

বিস্ফোরণের উত্তরণ ছুঁয়ে কয়েকটি শব্দ;

সুরের মূর্ছনায় হিমবাহ বরাবর,

অস্ত্বিত্বের স্পন্দনে কেবলই প্রগাঢ় আঁধারে,

মুখোমুখি দ্বন্দ্বের আয়োজনে বিভোর থাকে।

প্রতীক্ষিত মেঘেরা দল বেঁধে ধেয়ে যায়--

স্বপ্নের ভিতর দিয়ে যেখানে বর্ষা,

ঘুম ভাঙার অপেক্ষায় প্রতীক্ষমান,

ব্যাখ্যাহীন বর্ণময় প্রাণবিন্দু, ক্ষনিকের

জন্ম দেয় দীর্ঘ পথ অপচয়ের শেষে।

 


Sunday, 26 July 2020

কৃষ্টি, কালচার, সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি ও মানভূম


কৃষ্টি, কালচার, সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি ও মানভূম
ড.  দয়াময় রায়

এক
'কৃষ্টি'--  শব্দটি বৈদিক শব্দান্তর্ভূ্ক্ত, যার অর্থ হলো কর্ষণ। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে,  বৈদিক ভাষায় কৃষ্টি মানে জাতি, যেমন পঞ্চকৃষায় মানে পাঁচ জাতি, আর্য জাতির পাঁচটি প্রধান শাখা-- অণু, দ্রুহ, তুর্বশ, যদু, পুরু বংশ পঞ্চ কৃষায়৷ কৃষ্টির ধাতুমূল কৃষ্ যার অর্থ কর্ষণ, চাষ করা, মনোভূমি কর্ষণ করাও বোঝায়।
" মনরে কৃষি কাজ জানো না --
এমন মানব জমিন রইল পতিত আবাদ করলে
ফলতো সোনা। "
এই মানব চিত্তভূমি কর্ষণ করাকেই কৃষ্টি বলা হয়ে থাকে।
'কালচার'-- ইংরেজি 'Culture ' শব্দের মূল লাতিন শব্দ 'কুলতুরা' ( Cultura ), কালচারের ধাতুমূল ল্যাটিন Col, আর তার মানেও কৃষ্টির মতোই চাষ করা, যত্ন করা বা পূজা করাও হয়ে থাকে। সভ্যতার আলোপ্রাপ্ত জাতির মধ্যে সভ্যতার ভিতরে অথচ বাইরে এক প্রকাশমান রূপটি হল
কালচার।
ষোড়শ শতকেও কালচার বলতে বোঝানো হতো
-- " Improvement or refinement by education and training. "
উনিশ শতকে তা হল  "The training and refinement of mind, tastes and manners ; the condition of being thus trained and refined; the intellectual side of civilization. "
' সংস্কৃতি ' শব্দটি ঋকবেদে নেই কিন্তু ' ঐতরেয় ব্রাহ্মণ্য ' গ্রন্থে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে শিল্পস্তুতি বিষয়ক উক্তিটি আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন,  সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশেষ করে ১৯২২ সালে প্যারিসে সুনীতিবাবুর এক মারাঠি বন্ধু  Culture বা Civilization-এর প্রতিশব্দ রূপে সংস্কৃতি শব্দটির কথা উল্লেখ করেন এবং সংস্কৃতি শব্দটি নাকি মারাঠি শব্দভান্ডারে বহুদিন থেকেই প্রচলিত আছে। রবীন্দ্রনাথ কৃষ্টির বদলে সংস্কৃতি শব্দ ব্যবহারের কথাই বলেন। কৃষ্টির সাথে সংস্কৃতির একটা মিল অনেকেই খুঁজে পান কিন্তু কৃষ্টির সাথে কৃতির সম্পর্ক, আর সংস্কৃতি বলতে গেলেই সংস্কারের কথা আসে, যা আমাদের সংস্কার করে, পরিশীলিত করে, মার্জিত করে, উন্নত করে তাই হল সংস্কৃতি। সংস্কৃতি শব্দটি ব্যাপকতম অর্থে প্রযুক্ত। নাচ-গান, আবৃত্তি, নাট্যানুষ্ঠান, বক্তৃতা, যাত্রা, আবার পোষাক পরিচ্ছদের ধরণধারণ, কথালাপ, আচার অনুষ্ঠান, হাঁটাচলা এমনকি সমগ্রজীবন চর্চার ভিতর দিয়েই সংস্কৃতির বিস্তার। সংস্কৃতি দ্যুতিময় যা আমাদের ক্ষুদ্রতা থেকে বৃহতের দিকে, শুরুর থেকে ব্যাপ্তির দিকে নিয়ে যায়, মানুষের জীববৃত্তি জনিত ক্রিয়াকলাপকে মনুষ্যবৃত্তিতে উত্তরণ ঘটায়। মানুষের জীবন সংগ্রামের মোট প্রচেষ্টাই হলো সংস্কৃতি।

' লোকসংস্কৃতি ' বলতে দুটি শব্দ--এক) লোক আর দুই)  সংস্কৃতি। লোক সংস্কৃতিতে যৌথ জীবন ভাবনার প্রকাশ ঘটে, লোক জীবনের অর্থাৎ গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন চেতনার প্রকাশ। ইংরেজি Folklore বা লোককৃতি । লোক গবেষক ড.তুষার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন," লোকায়ত সংহত সমাজের মূলত সমষ্টিগত জীবন চর্যার ও মনন চর্চার স্বতঃস্ফূর্ত -- সামগ্রিক কৃতিই লোককৃতি বা লোক সংস্কৃতি। "
আর সেই লোকসংস্কৃতি নানান ধরনের বস্তুকেন্দ্রিক, আচার অনুষ্ঠান কেন্দ্রিক, খেলাধুলা কেন্দ্রিক, লিখন- অঙ্কন কেন্দ্রিক প্রভৃতি।

মানভূম নাচভূম আর গানভূম। যা লোক সংস্কৃতির এক আকর ভূম। মানভূম জেলা গঠনের (১৮৩৩) আগে এই জেলা জঙ্গল মহল(১৮০৫ ) জেলা রূপে পরিচিত হয়েছিল। একালেও জঙ্গলমহল কথাটি খুবই উচ্চারিত হয় তাছাড়া পশ্চিমাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল এরকম  নানা নামে পশ্চিম বাংলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ক জোন রূপে আলোচিত হয়ে আসছে। কিন্তু ছোটোনাগপুরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এক ভূম রূপে এ বাংলায় মানভূম সে ধারা ধরে রেখেছে।
এর কারণ কি উত্তরই বা কি? ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এক পীঠস্থান রূপে এ মাটি  ঐতিহ্যবাহী।  গঙ্গানারায়ণ বিদ্রোহ ( ব্রিটিশ কথিত হাঙ্গামা) উত্তরকালে মানভূম জেলা সৃষ্টি হল (১৮৩৩)।  সেই ভূমি খন্ডকে কেন্দ্র করে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য,  লোকসংস্কৃতি আর উত্তরাধিকার। আদৌ তা ১৮৭ বছরের সংস্কৃতি বা লোক সংস্কৃতির উত্তরাধিকার রূপে গড়ে উঠেনি।   হাজার বছরের বেশি আগের চর্যাপদে ঝুমুরের প্রাণ প্রবাহের সুরে সুরে লয়ে লয়ে গড়ে উঠল সেই ইতিহাস, সেই সংস্কৃতি। কিংবা সে ইতিহাস চর্চাও জারী আছে প্রতিনিয়ত , যুগান্তরের ইতিহাস একদিন হয়তো বা প্রত্যয়িত হবে আপন আলয়ে।  তেমনই বাহা, সেঁরেএ, করম, জাওয়া, ভাদু, টুসু, ছৌ নাচ প্রভৃতি নানান লোকযান, লোকসংস্কৃতির মনোহর এক মুলুক রূপে বাংলার এই প্রান্তসীমা আনন্দে মগ্ন থেকেছে চিরকাল আজো সেই আনন্দেই মগ্ন । অর্থনৈতিক অভাব থাকলেও সংস্কৃতির প্রভাব বা  প্রবাহ বেগ কমে নি বরং তা বেড়ে চলেছে। লোকজ আচার-আচরণ, কৃতি এবং সংস্কার সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা নিয়েই তা কালান্তরে প্রবহমান।

সংস্কৃতির চারটি দিক --নৃত্য, গীত, চিত্র ও সাহিত্য।  নৃত্যের সাথে সাথে চলে এসেছে গীত, সেকারণে এখানকার সংস্কৃতির মৌল বৈশিষ্ট্যই হল নৃত্য গীতের যুগল মূর্তি, আর যূথবদ্ধতা। যেকারণে মানভূমসহ ছোটোনাগপুরের লোক সংস্কৃতি মূলত  নৃত্যগীত ধর্মী।  এখানকার জীবন প্রকৃতি সাংস্কৃতিক স্রোতে একটা সমন্বয় তথা উদারতা বিদ্যমান। যা ভারতীয় সংস্কৃতিরও মূল বৈশিষ্ট্য।

' ময়মনসিংহ গীতিকা'--সংগ্রহের ক্ষেত্রে ভাষাচার্য দীনেশ্চন্দ্র সেন সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে, পল্লীকবি জসীমুদ্দিন প্রমুখের অবদান অনস্বীকার্য। মানভূমের ছৌনাচ বিশ্ববিদিত ভুবন বন্দিত ঠিক কিন্তু ঝুমুর গান যার ঐতিহ্য হাজার বছরের বেশি তা থেকে গেছে আমাদের লোকভূমির মানস চেতনায়। আজো ঝুমুর বাংলা সাহিত্যভূক্ত হয়নি  বা সেভাবে আলোচনায় জায়গা আসেনি। যেভাবে ময়মনসিংহগীতিকা বাংলা ভাষা সাহিত্যের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, যা  বাংলা ভাষা সাহিত্যের সিলেবাসের অন্তর্ভূক্ত।  ঝুমুরকে লোক সংস্কৃতির বিষয় রূপে চিহ্নিত করে পাঠ্যসূচি ভূক্ত করা হয়েছে। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে যোগ্যতম ভূমিকায় অবতীর্ণ, পরবর্তী ক্ষেত্রে বিশ্বভারতী, রবীন্দ্রভারতী এবং কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যসূচি ভূক্ত করে লোক সংস্কৃতি প্রসারে উদ্যোগী। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় লোক সংস্কৃতি বিভাগ চালু (১৯৯১) করে  এই ধারাকে আরো উন্নত করে।

দুই
সিধো-কানহো- বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছৌ - ঝুমুরের ডিপ্লোমা কোর্স চালু হয়েছে, যা চূড়ান্ত ভাবেই সদর্থক দিক। মানভূমী লোকসংস্কৃতির চিরায়ত ধারার চর্চা, অনুশীলন  এবং সঠিক ভাবে মানভূমের সংস্কৃতিকে, ভাষা- সুর- আঙ্গিক সেই ধারাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং রক্ষা করার নিমিত্তেই গড়ে উঠছে নানান সাংস্কৃতিক সংগঠন ও আন্দোলন। এবং বেসরকারি স্তরের সংস্থাগুলির প্রধান কাজ হোক সবাইকে একত্রিত করে মানভূমের জনজীবন, লোকাঙ্গিক, ঘরাণা, ভাষা, গায়কী আর ধারাবাহিক প্রবাহধর্মকে ঐতিহ্যানুসারে বাঁচিয়ে রাখা। করোনা বিরাট থাবা বসিয়েছে লোকশিল্পী  এবং লোক শিল্পের উপরে, এই লোক সংস্কৃতি বা তার নানান রূপই সমস্ত ধ্রুপদ শিল্প সংস্কৃতির আকর স্বরূপ। 

সূত্রঃ
১) সংস্কৃতির রূপান্তর ---গোপাল হালদার।
২) বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, ( সম্পাঃ )
ড. জ্যোতির্ময় ঘোষ।

Thursday, 23 July 2020

বিদ্যুৎ মিশ্র

অপেক্ষা 
বিদ্যুৎ মিশ্র

আর বেশিদিন নেই অপেক্ষারা জানে
কখন ফুটবে ফুল পাতাঝরার পরে
মলিন রঙে ঢাকা সব প্রিয় মানুষের মুখ
ধুলো জমে আছে আয়নায় একটু খানি ঝড়ে।

মুছে গেছে সব অনুতাপ পলি জমেছে শুধু
অহংকার ঘিরে রেখেছে বাতাস গুমোট এখন
বারে বারে ক্ষমা চেয়ে ফিরে গেছে একদল মানুষ
চারদিকে বোঝা হয়ে আছে দেখিনি তখন।

সূর্য ডুবে গেলে শুধু অন্ধকার ধেয়ে আসে
ঢেউ গুলো ফিরে পায় উচ্ছ্বাসে একটু অনুকূলে
কামনার রঙে ধরা দেয় এ যাবত হারানো ওম
গান লিখে উদ্বাস্তু ছন্নছাড়া নিজের ভুলে।

তবু অপেক্ষা থাকে একদিন স্বাভাবিক হবে
ক্লান্তি মুছে আলো জ্বলে উঠবে কলরবে।

বেবী পোদ্দার

ভালোবাসার জয়গান
বেবী পোদ্দার

যে মন নিয়েছো চুরি করে
সে মন সামলে রেখোঝিনুকের ভিতরে যেমন মুক্তো থাকে।
আমার যা কিছু ভালোবাসা অভিমান সবকিছু
গচ্ছিত রেখেছি তোমার কাছে ।
যেদিন হাতে হাত ধরে
দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছুটবো
নীল আকাশ ছাড়িয়ে মহাশূন্যে ভাসবো ।
সব সংকোচ বাধা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে
ভালোবাসার সমুদ্রে তরী হবো ।
সমুদ্রের ধারে ভোর বেলায় দাঁড়ালে যেমন মনে হয়
সূর্য সমুদ্র গর্ভ থেকে উঠে আসছে তেমনি
কিছু তরী যেন শেষ ঘাটে পৌঁছনোর জন্যই রয়েছে অপেক্ষায়।
এসো বাতাস আমাকে সঙ্গী করে বয়ে নিয়ে চলো ওই দূর দিগন্তের দিকে ।
এসো রাত্রি ওই উর্মিমালার মতো আমাকে চূর্ণ করো ।
এই বালুচরে লিখে গেলাম ভালোবাসার জয়গান,
যার সুর ধ্বনিত হবে যুগ থেকে যুগান্তরে।

মৃণাল কান্তি দে'র কবিতা

দুটি কবিতা মৃণাল কান্তি দে যখন আমি খুব প্রেমিক           চাঁদের আলোয় চোখ রেখেছি মনের আকাশে সাজাই তারা; মুহূর্তকে তাই আগলে রাখি ...